ভারতের ইতিহাস

ভারতের প্রাচীন প্রস্তর যুগের মূল বৈশিষ্ট্য

দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয়েছে। মানবজাতির এই সুদীর্ঘ বিবর্তনের প্রথম ও প্রায় সভ্য পর্যায়টি হল প্রস্তর যুগ। হাতিয়ার এর গঠন প্রণালী, ধরন এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বিভিন্নতার ভিত্তিতে প্রস্তর যুগকে তিনটি প্রাথমিক পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যথা এক. প্রাচীন প্রস্তর যুগ দুই মধ্য প্রস্তর যুগ তিন, নব্য প্রস্তর যুগ৷
প্রস্তর যুগের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই যুগের সূচনাকাল প্রায় 40 লক্ষ্য বছর পূর্ববর্তী সময় ধরা হয়। আবার অনেকের মতে এর সূত্রপাত হয় কুড়ি লক্ষ বছর পূর্বে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে এই যুক্তির সূত্রপাত আনুমানিক এ লক্ষ বছর পূর্ব হয়েছিল। কিছু পন্ডিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন ভারতবর্ষে প্রাচীন প্রস্তর যুগ ৪০০০ BCE পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
প্রাচীন প্রস্তর যুগের সময় কালের বিশালত্বের উপর দৃষ্টি রেখে এই যুগে প্রস্তর নির্মিত হাতিয়ার এর বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে পুরাতত্ত্ববিদেরা প্রাচীন প্রস্তর যুগকে আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন।
যথা ক. নিম্ন বা প্রাচীন পুরা প্রস্তর যুগ খ. মধ্য পুরা প্রস্তর যুগ গ. উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগ।
ভারতে প্রধানত দুটি অঞ্চলে প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। একটি হলাে পাঞ্জাবের সােয়ান নদী অববাহিকা অপরটি হল দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ৷ ফলে এই দুটো সংস্কৃতি একটি কে বলা হয় সােয়ান সংস্কৃতি(Soan culture) অপরদিকে বলা হয় মদ্রিাজ সংস্কৃতি( Madras culture)। দুটি সংস্কৃতির সময়কাল বৈশিষ্ট্য একই। তাদের উৎপত্তিস্থল হলাে নদী উপকূল। এছাড়াও সিন্ধু প্রদেশে মাইলস্টোন 101 ও সুকুর রাই অঞ্চলে কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এছাড়া লাদাক অঞ্চল, উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর ও মহীশূর, অন্ধ্রপ্রদেশ, কম্বলপুর, ফুলবনি, গুজরাট, রাঁচি, হাজারীবাগ, বাঁকুড়ার শুশুনিয়া ও বীরভূমে বেশকিছু প্রাচীন প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্যে প্রাচীন প্রস্তর যুগের বৃষ্টিপাত, আদ্রতার তারতম্য জানা সম্ভব হয়েছে। কাশ্মীরের আবহাওয়া সম্পর্কে যে তত্ত্বটি উপস্থাপন করা হয় তা কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত| প্রথম পর্যায়ে 35 লক্ষ বছর আগে থেকে শুরু করে বা তারও আগে পর্যন উষ্ণ নাতিশীতােষ্ণ আবহাওয়া ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল শীতল নাতিশীতােষ্ণ আবহাওয়া। তৃতীয় পর্যায়টি হলাে শীতলতম৷ রাজস্থানের বালিয়াড়ি ঢলে পুরাতন প্রস্তর যুগের যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তা থেকে অনুমান করা সম্ভব হয় যে আবহাওয়া ছিল অতিশয় শঙ্কা আরব সাগরের নিচ থেকে সংগৃহীত স্তর পরম্পরা নমুনা থেকে অনুমান করা হয় যে 18 হাজার বছর আগে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার একটি পর্যায়ে ছিল। তবে এ পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জানা যায়নি।
প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাতিয়ার ছিল আয়তনে অনেক বিশাল এবং তাতে কোন সৌন্দর্য ছিল না ও মসৃণতা ও ছিল না। প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাতিয়ার গুলির মধ্যে মধ্যে ছিল ব্লেড বা লম্বা চিলকা, হাত কুঠার, ছেদক, ব্যাসল্ট চার্ট জাতীয় পাথর প্রভৃতি। মধ্য পুরা প্রস্তর যুগে হাতিয়ার একটু পরিবর্তন এসেছিল আগের তুলনায় হালকা ও পাথরের থেকে সেগুলাে তৈরি হতাে। এগুলােকে বলা হয় Hake implements| এই সময় ভ্রমর ও তুরপুন, স্ক্র্যাপার বা চাঁচনি, শল্য এবং ব্লেড এর ব্যবহার বেড়ে যায়। এই সময় কোয়ার্টজ পাথরের বদলে অ্যাগেট, জ্যাসপার পাথরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগের লম্বা ফলাও খােদকের ব্যবহার বহুল প্রচলিত হয়। এই পর্যায়ের হাতিয়ার ছিলপরিবর্তন এসেছিল আগের তুলনায় হালকা ও পাথরের থেকে সেগুলাে তৈরি হতো। এগুলােকে বলা হয় Hake implements এই সময় ভ্রমর ও তুরপুন, স্ক্র্যাপার বা চাঁচনি, শল্য এবং ব্লেড এর ব্যবহার বেড়ে যায়। এই সময় কোয়ার্টজ পাথরের বদলে অ্যাগেট, জ্যাসপার পাথরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগের লম্বা ফলাও খোদকের ব্যবহার বহুল প্রচলিত হয়। এই পর্যায়ের হাতিয়ার ছিল অ্যাকিউলিয়ন প্রকৃতির।
প্রাচীন প্রস্তর যুগের একেবারে শেষপ্রান্তে অর্থাৎ উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগের আধুনিক মানুষের(Homo sapiens sapiens) উদ্ভব ঘটেছে। তার আগের পর্বগুলােতে হােমাে স্যাবিলিস, হােমাে ইরেকটাস, হােমাে নিয়ান্ডার্থাল এদের অস্তিত্ব দেখা যায়। সাধারণভাবে বিক্ষিপ্ত নিদর্শন দেখে মনে হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ খাদ্য সংগ্রহ এবং আত্মরক্ষার প্রয়ােজনে দলবদ্ধ জীবন গড়ে তুলেছিল। এটাই ছিল মানব সমাজের উষালগ্ন। প্রাচীন প্রস্তর যুগের পরিবারের প্রকৃতি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতবিরােধ আছে ডারউইন ও তার অনুগামীরা মনে কর ন এই আদিম পরিবার ছিল পিতৃতান্ত্রিক। কিন্তু আধুনিক গবেষকরা মনে করেন আদিম সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক প্রকৃতির। তবে এটা অনেকটাই অনুমান নির্ভর।
প্রাচীন প্রস্তর যুগে অর্থনৈতিকভাবে মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রাহক৷ প্রাথমিকভাবে নানা ধরনের লতা পাতা, ফলমূল, পাখির ডিম, ব্যাংক, ইঁদুর প্রভৃতি ক্ষুদ্র পশু খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। পরবর্তীকালে ছাগল, গরু,শুয়োর, হরিণ প্রভৃতি পশুর মাংস তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। এছাড়া কচ্ছপ ও মাছ খাদ্য তালিকায় ছিল।
প্রাচীন প্রস্তর যুগের বেশিরভাগটাই ছিল তুষার যুগের অন্তর্গত। সেই কারণে শীতলতার হাত থেকে রক্ষা পেতে মানুষ পাহাড়ের গুহায়, পর্বতচ্চত্রের নিচে, মাটির গর্তে বাস করত৷ মূলত মধ্য ও উচ্চ পর্যায়ে গুহা ব্যবহারের প্রাচুর্য শুরু হয়। কারণ মানুষ এই সময় আগুন আয়ত্ত করে। ভীমবেটকা এরকমই একটি পাহাড়শ্রেনিতে হাজার খানেক গুহা আবিষ্কৃত হয়েছে।
পুরা প্রস্তর যুগের গুহাবাসী মানুষ তাদের জীবনযাত্রার কিছু চিত্র অতি সুন্দর ভাবে চিত্রিত করে গেছেন বিভিন্ন গুহার দেওয়ালে। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকায় এইরকম গুহা চিত্র পাওয়া গেছে৷ তবে এই গুহার সব চিত্রগুলি প্রাচীন প্রস্তর যুগের নয়।
প্রাচীন প্রস্তর যুগের শেষের দিকে মনের ভাব আদান প্রদানের জন্য ভাষার উদ্ভব হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। প্রথম দিকে বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দের ব্যবহার থেকেই ভাষার উদ্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়৷ ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন গােষ্ঠীবদ্ধ সমাজে মানুষ পাশাপাশি থাকার ফলে ভাব বিনিময়ের জন্য ভাষার উদ্ভব হয়৷ এটিকে তারা ‘মেলামেশা তত্ত্ব’ বলেছেন। তবে প্রাচীন প্রস্তর যুগের ভাষা ছিল অনেকটাই ‘পাশব প্রকৃতির’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *